Love story জেনিফার চলে যাওয়ার পরে শামসুল
আলম ডায়েরি লিখতে শুরু করে। যেদিন
কিছু লিখতে ইচ্ছে করে না, সেদিন
তারিখের ঘরে লাল দাগ দেয়। মন
ভালো থাকলে ছোট্ট ফুল-পাখি আঁকে,
নইলে টিকচিহ্ন দেয়। একটি লাল
কালির বলপেন রাখা আছে ডায়েরির
সঙ্গে। ডায়েরি লেখার আ Love story ট দিন পার
হয়েছে আজ।
সকাল থেকে মাথা কেমন ঝিমঝিম
করছে। এ ঘরে ও ঘরে পায়চারি করে
বারান্দায় আসে। ধানমন্ডির দোতলা
বাড়ির বারান্দাটি তার প্রিয়
জায়গা। দক্ষিণ দিকের ছোট
বারান্দাটি জেনিফারেরও পছন্দ
ছিল। অজস্র দিন দুজনে এখানে বসে চা
খেয়েছে। শামসুল আলম ঘাড় কাত করে
আকাশ দেখে। টুকরো আকাশ। চারপাশে
হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের কারণে Love story
আকাশের অখণ্ডতা দেখা যায় না।
যেটুকু দেখতে পাচ্ছে, সেই আকাশভরা
ঘন কালো মেঘ দেখতে পায় শামসুল
আলম। বৃষ্টি নেই, ঠান্ডা বাতাসও না।
জমাট বাঁধা মেঘ স্তব্ধ করে দেয়
তাকে। মেঘ জেনিফারের খুব প্রিয়
ছিল, বৃষ্টি না। ও বলত, বৃষ্টি আমার আনন্দ
নষ্ট করে দেয়। মেঘের ভেসে থাকায়
আমি প্রেমের আশ্চর্য স্নিগ্ধতা উপভোগ
করি। Love story
শামসুল আলমের দুহাত মুঠিতে নিয়ে
বলত, বর্ষায় ঘনকালো মেঘ, ‘তোমার
দেশে এসে আমার এই মেঘ দেখা
হয়েছে শামসু। আমি এই মেঘে তোমার
ভালোবাসার আকাশ দেখতে পাই।
তোমার ভালোবাসা আমাকে
ভরিয়ে দেয়।’ Love story
ঘরে ঢুকে ডায়েরিতে কথা কয়টি
লিখে ফেলে শামসুল আলম। লিখে বেশ
স্বস্তি বোধ করে। আনন্দও হয়। ডেক
ছেড়ে দিলে সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠস্বর
ভেসে আসে। জেনিফারের প্রিয় গান
ধ্বনিত হয় ঘরজুড়ে, ‘সীমার মাঝে অসীম
তুমি বাজাও আপন সুর...।’ Love story
জেনিফার হাসতে হাসতে বলত, ‘এটাই
সবচেয়ে সুন্দর প্রেমের গান।’
শামসুল আলমের মনে হয়, এত দিনে সে
নিঃসঙ্গতার আসল অর্থ খুঁজে পেয়েছে।
আগে একা থাকলে মন খারাপ হয়ে
যেত। এখন একাকিত্ব মানে Love story
জেনিফারকে অনুভব করার পূর্ণতা।
স্মৃতি মহাসমুদ্রের মতো কল্লোলিত হয়।
ভরে যায় বুকের সবটুকু। তা শুধু স্থির
থাকে না, প্রবাহিত হয়। এই অনুভব শামসুল
আলমকে দ্বিতীয় জন্মের মগ্নতা দেয়। এই
বাড়িতে জেনিফার নেই, এটা আর
জোর করে মানতে হয় না। এই তো আসনে
আছেও। হাত বাড়িয়ে সবকিছু ছোঁয়ার
মধ্যে জেনিফার। টেলিফোনে কণ্ঠস্বর
পাওয়া যায়—কানে কানে কথা হয় ওর
সঙ্গে। ফেসবুকে আছে। স্কাইপেতে
মুখোমুখি দেখা হয়।
তারপরও শামসুল আলমের বুকভরা
দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ওড়ে। সুখে
উচ্চারিত হয় মৃদু কথা, হায় জীবন!
ভালোবাসার আবেগ ঢুকে গেছে
ইন্টারনেট। ৭৫ বছর বয়সে এমন অনুভূতি
শামসুল আলমকে বিষণ্ন করে ফেলে।
বিবাহিত জীবনের ৪৭ বছরে এসে
জেনিফার সরাসরি চোখের দিকে
তাকিয়ে একদিন বলল, ‘এবার আমি
নিজের দেশে ফিরে যেতে চাই।’
‘ফিরে যাবে? কেন?’
‘অনেক দিন তোমার দেশ দেখেছি।
শেষ দিনগুলো নিজের দেশে থাকতে
চাই। তুমিও আমার সঙ্গে চলো।’
শামসুল আলম চুপ করে থাকে।
অসহিষ্ণু কণ্ঠে জেনিফার জিজ্ঞেস
করে, ‘যাবে না?’
‘আমিও তো আমার শেষ দিনগুলো
নিজের দেশে কাটাতে চাই।’
তুমি অত্যন্ত স্বার্থপরের মতো কথা
বললে শামসু। তুমি একটুও ভাবলে না যে
আমি ৪৭ বছর এ দেশে কাটালাম। এখন
চলো দুজনে গিয়ে আমার দেশে
থাকি।
শামসুল আলম সরাসরি অন্যদিকে
তাকায়। জেনিফারের মুখের ওপর
থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। জেনিফার
জবাব না পেয়ে উঠে চলে যায়। দুজনেই
বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অবসর
নিয়েছে। ছেলে দুটো পড়ালেখার
জন্য স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায়
গিয়েছে। বাড়িতে তারা দুজন ছাড়া
কাজের ছেলে মাসুম ও ড্রাইভার-
দারোয়ান আছে। শুধু বসে আড্ডা
দেওয়ার মতো বন্ধুর অভাব। দুজনে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়ি
ছেড়ে ঢাকায় নিজেদের বাড়িতে
বাস করছে। তাও বছর সাতেক হয়ে
গেছে। অমিয় আর দ্বিতীয় চলে গেছে
তাও বছর তিনেক হয়ে গেল। ছেলেরা
বলেছে, ওরা আর দেশে ফিরবে না।
বাবা-মা যেন আমেরিকায় ওদের
কাছে গিয়ে থাকে। এ কথায় শামসুল
আলম খুব মন খারাপ করেছে। জেনিফার
ওদের ফেরা না-ফেরা নিয়ে মাথা
ঘামায় না। উল্টো বলে, ‘ওদের জীবন
ওরা বেছে নিয়েছে। আমি হ্যাপি।
লেট দেন লিভ পিসফুলি।’
শামসুল আলম হা হা করে হেসে বলেছে,
‘এই সময় কারও লাইফ পিসফুল হয় না। তুমি
আর আমি পিসফুল লাইফ কাটিয়েছি।
আমাদের ৫০ বছর পূর্ণ হলে আমরা দিনটি
বড় করে সেলিব্রেট করব।’
সেদিন জেনিফারের চোখে খুশির
আভা দেখেনি শামসুল আলম। ও কেমন
যেন অন্যমনস্ক ছিল। ভুরু জোড়া অন্য
রকমভাবে কুঁচকে ছিল। শামসুল আলমের
মনে হয়েছিল ওকে একদম অন্য রকম
লাগছে। জেদি, একরোখা বা অন্য
কোনো শব্দ ব্যবহার করা যেতে
পারে ওর জন্য। শামসুল আলম তা করেনি।
খানিকটুকু খটকা নিয়ে চুপ করে রইল।
বিবাহিত জীবনের এত বছরে এভাবে
ভুরু কুঁচকায়নি জেনিফার। সেই ভঙ্গির
সঙ্গে এই ভঙ্গির অনেক দূরত্ব। আজ নতুন
জেনিফার ওর সামনে। ৭২ বছর বয়সে
এসে জেনিফার কেন ওর প্রেমের
পৃথিবী থেকে বেরিয়ে যেতে
চাইছে? প্রেমের শুরুর দিনগুলোতে কী
এক গভীর উন্মাদনা ছিল দুজনের। কী
গভীর হৃদ্যতায় জেনিফার বারবারই বলত,
প্রেমের কোনো সীমান্ত নেই শামসু।
আমাদের সামনে আছে প্রেমের বিশ্ব।
আজ কী হলো জেনিফারের?
শামসুল আলমের চোখে পানি আসে।
জেনিফার তাকে বলত, ‘প্রেমের
সীমান্ত শুধুই নীল আকাশ। প্রেমের খুঁটি
ফুল মুন। প্রেমের লুকোচুরি চোখের
ছুটোছুটি।’—এসব বলে প্রবল হাসিতে ঘর
ভরিয়ে দিয়ে বলত, ‘তোমার-আমার
প্রেমের বাঁধন রংধনুর রঙে হয়েছে
শামসু। আমাদের মহাকাশে হাজার
রঙের ছড়াছড়ি।’
জেনিফার এমন কথা বলে দীর্ঘ উষ্ণতায়
ভরিয়ে দিত দীর্ঘ সময়। তখনো শীতল
প্রবাহ ছোঁয়নি শামসুল আলমকে। ওই
মুহূর্তে ওর মনে হয়েছিল, বরফের অতল
গহ্বরে পড়ে যাচ্ছে ও। তারপরও
নিজেকে টেনে তোলার জন্য বিড়বিড়
করে বলেছিল, আমাদের প্রেম তো
জ্যোৎস্নাভরাই ছিল, জেনিফার।
প্রেমের বাইরে জীবন কাটাইনি।
আমার কাছে প্রেমের ফুল মুনই সত্য। তবে
আজ কেন তোমার দেশে ফেরার কথা
মনে হচ্ছে? তুমি তো দেশ থেকে দূরে
ছিলে না। আমরা বছরে না হলেও
দুবছরে তিন বছরে আসা-যাওয়া
করেছি। তাহলে তুমি এমন করে ভাবছ
কেন? কেন সম্পর্কের চেয়েও নিজের
কাছে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে বেশি
হয়ে গেল? নিজের আপন জগৎ? শিকড় আর
লতাপাতায় ভরা? শুনতে পায় নিজের
ভেতরের শব্দ, তুমিও তো জেনিফারকে
এই উত্তর দিয়েছ শামসুল আলম, তুমি কেন
প্রেমের জন্য দেশ ছাড়তে পারবে না?
কিছুকাল তো ওর দেশে কাটিয়ে
আসতে পারো?
না, অসম্ভব। ওর দেশে আমি বিদেশি।
বিদেশির যত অধিকারই থাকুক, আমি
তাকে সম্মানজনক মনে করি না।
শামসুল আলম দুহাতে নিজের চুল আঁকড়ে
ধরে। এ-ও একধরনের মানসিক আশ্রয়। চুল
ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলে, যেদিন
এডিনবরার আকাশে পূর্ণচন্দ্র
দেখেছিলাম সেদিন জেনিফার
বলেছিল, একমাত্র আমার প্রেম
নিভিয়ে দেবে, আর কিছুতে প্রেমে
টান পড়বে না। শামসুল আলম বলেছিল,
আমি তোমার আগে আমার মৃত্যু চাই।
মৃত্যুর সময় যদি বিছানায় থাকি, তাহলে
তোমার হাত ধরে রাখব।
সেদিন জেনিফারের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে
গিয়েছিল। কথা বলেনি। দ্রুতপায়ে
বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করেছিল। ওর
মৃদু কান্নার শব্দ আচ্ছন্ন করে বলেছিল
শামসুল আলমকে। যেন এই নিঃসঙ্গ
বাড়ির সবখানে কান্নার শব্দ জমে
বরফের মতো জমাট বেঁধে আছে।
জেনিফারকে এয়ারপোর্টে বিদায়
দিয়ে বাড়ি ফেরার পরে অনেকক্ষণ
কেঁদেছিল শামসুল আলম। মনে হয়েছিল,
নিজের শৈশবেও তাকে এমন করে
কাঁদতে হয়নি। নিজের কান্নার শব্দও
জেনিফারের কান্নার সঙ্গে
মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
এক বিকেলে ফোন আসে
জেনিফারের।
‘তুমি কেমন আছো, শামসু?’
‘আমি জানি না আমি কেমন আছি।’
শব্দ করে হাসতে থাকে জেনিফার।
শামসুল আলম সেই শব্দ নিজের দুকানে
তুলে নেয়। হাসি থাকলে জেনিফার
বলে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমি পড়াতে
ইকোনমিকস, এখন দেখছি তোমার
সাবজেক্ট হয়েছে ফিলসফি।’
প্রেমের শুরুর দিনগুলোতে কী এক গভীর
উন্মাদনা ছিল দুজনের। কী গভীর
হৃদ্যতায় জেনিফার বারবারই বলত,
প্রেমের কোনো সীমান্ত নেই শামসু।
আমাদের সামনে আছে প্রেমের বিশ্ব।
আজ কী হলো জেনিফারের?
আবার তরঙ্গ তোলা হাসি। শামসুল
আলমের মন খারাপ হয়। তাহলে
জেনিফার নিজ দেশে খুব ভালো
আছে। ওর প্রাণের ভেতরে সুবাতাস
বইছে।
‘তুমি এত গম্ভীর হয়ে আছো কেন,
শামসু? তোমার কাছ থেকে উষ্ণতা
পাচ্ছি না।’
‘তুমি কেমন আছো, জেনিফার?’
‘আমি ভালো আছি। আমাদের দিনের
শুরুতে তুমি যখন এডিনবরার মাটি-
বাতাসে শ্বাস নিতে, তখন আমরা
যেসব জায়গায় ঘুরতে যেতাম, এখন আমি
সেসব জায়গায় গিয়ে বসে থাকি।
বেশ এনজয় করি। কখনো মনে হয়, তুমি
আমাকে দীর্ঘ চুমুতে ভরিয়ে দিয়ে বলছ,
জেনিফার, আমাদের ভালোবাসা এখন
আমি একই শারীরিক উষ্ণতায় প্রেমের
নতুন অনুভবে ভরে থাকি।’
জেনিফারের উচ্ছ্বাসপূর্ণ কণ্ঠস্বরে মন
খারাপ হয়ে যার শামসুল আলমের।
আশ্চর্য! ও এত নিষ্ঠুর। পরক্ষণে নিজেকে
শাসায়, কেন এমন ভাবছি! নিজের
প্রেমও কি উবে গেছে?
ভেসে আসে জেনিফারের কণ্ঠস্বর,
‘তোমার কি মন খারাপ, শামসু? নাকি
শরীর খারাপ?’
‘আমার মন খারাপ, শরীরও খারাপ। কিছুই
ভালো লাগে না। বেঁচে থাকতে
ইচ্ছে করে না।’
‘তুমি ভালো থাকো, শামসু। আমি
তোমাকে দেখতে আসব।’
উৎফুল্ল হয়ে ওঠে শামসুল আলম।
‘সত্যি আসবে? কবে?’
‘মাস দু-একের মধ্যে। সবকিছু ঠিকঠাক
করতে পারলে আগেও আসতে পারি।’
‘থ্যাংক গড। তুমি ভালো থাকো
জেনিফা। আমি তোমার আসার
অপেক্ষায় থাকব।’
আবার সেই উচ্ছ্বসিত হাসি। হাসির
মাঝে কেটে যায় ফোন। শামসুল আলম
মগ্ন চৈতন্যে শিস বাজায়। আজ
আমাদের ছুটি। জীবনের কাঠঘর থেকে
ছুটি। চেয়েছিলাম কাঠের ওপর ছবি
আঁকতে। রং-তুলিতে ঘর সাজানো হয়
কিংবা হয় না। মানুষ তো অনবরত
নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে। যুদ্ধ করে হেরে
যাওয়া নিয়তি যুদ্ধ করে বিজয়ী হওয়া
সাহসী। থেমে যায় ভাবনা। শামসুল
আলম টের পায় জ্বর এসেছে। বুকের
কাছে ব্যথা হচ্ছে। শামসুল আলম সোফায়
মাথা হেলিয়ে দেয়।
মাস খানেকের মাথায় জেনিফার ই-
মেইলে ওর আসার খবর জানায়। সঙ্গে
ভালোবাসার বাক্য দিয়ে ভরিয়ে
দেয় ই-মেইলের বাকি অংশ। ই-মেইলের
হার্ড কপি কতবার পড়ে তার ঠিক নেই,
সঙ্গে দুহাতে চোখের জল মোছে।
বুঝতে পারে শরীর ভালো নেই।
ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার।
পরে ভাবে, জেনিফার আসুক, দুজনে
একসঙ্গে ডাক্তারের কাছে যাবে।
বিছানায় জেনিফারের ছবিগুলো
করা আছে। যখন ইচ্ছা হয় সে ছবি দেখে।
কখনো বুকের ওপর রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
যেদিন জেনিফার আসবে, তার আগের
রাতে ড্রাইভারকে এয়ারপোর্টে
যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে ঘুমানোর জন্য
দরজা বন্ধ করে শামসুল আলম। তারপর দিন
সে দরজা আর খোলে না। জেনিফার
বাড়িতে পৌঁছে দেখতে পায় মাসুম
সিঁড়িতে বসে গুনগুনিয়ে কাঁদছে।
জেনিফার ওর মাথায় হাত রেখে
জিজ্ঞেস করে, ‘কাঁদছিস কেন? কী
হয়েছে?’
‘স্যার আজ সকালে দরজা খোলেনি।’
‘দরজা খোলেনি?’ চমকে ওঠে
জেনিফার। কয়েক দিন আগে ফোনে
কথা হলে বলেছিল, ‘শরীর ভালো নেই।
তোমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে
যাব।’ জেনিফার দরজায় দাঁড়িয়ে টুকটুক
শব্দ করে। ভেতর থেকে কোনো সাড়া
নেই। আস্তে আস্তে শব্দে জোর বাড়ায়।
তা-ও সাড়া নেই। শব্দ করে কেঁদে ওঠে
জেনিফার। শেষে চোখ মুছে
আত্মীয়স্বজনকে ফোন করতে শুরু করে।
ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন এসে জড়ো হয়
বাড়িতে। ছোট ভাই নূরুল আলম বলে,
‘আমাদের দরজা ভাঙা ঠিক হবে না।
আমাদের উচিত থানায় ফোন করা।
পুলিশ আসুক।’
সবাই সায় দেয়।
থানায় ফোন করলে পুলিশ আসে। দরজা
ভাঙা হয়। সবার আগে এগিয়ে যায়
জেনিফার। দেখতে পায় ওর ছবি বুকের
ওপর রেখে না-ফেরার দেশে চলে
গেছে শামসুল আলম। তার নিশ্বাসের
সঙ্গে বুকের ওঠানামা নেই। ও এগিয়ে
গিয়ে শামসুল আলমের ডান হাত ধরে।
শীতল হাতে উষ্ণতা নেই। বিড়বিড়
করে বলে, এমন তো কথা ছিল না যে
আমাকে রেখে চলে যাবে তুমি।
সঙ্গে সঙ্গে খাটের পাশে বসে পড়ে
দু-হাতে জড়িয়ে ধরে শামসুল আলমের
হাত। নিজেকেই বলে, তোমার এই
শীতল হাতই আমাদের প্রেম। তুমি যাচ্ছ,
এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াও। আমি আসছি।
আলম ডায়েরি লিখতে শুরু করে। যেদিন
কিছু লিখতে ইচ্ছে করে না, সেদিন
তারিখের ঘরে লাল দাগ দেয়। মন
ভালো থাকলে ছোট্ট ফুল-পাখি আঁকে,
নইলে টিকচিহ্ন দেয়। একটি লাল
কালির বলপেন রাখা আছে ডায়েরির
সঙ্গে। ডায়েরি লেখার আ Love story ট দিন পার
হয়েছে আজ।
সকাল থেকে মাথা কেমন ঝিমঝিম
করছে। এ ঘরে ও ঘরে পায়চারি করে
বারান্দায় আসে। ধানমন্ডির দোতলা
বাড়ির বারান্দাটি তার প্রিয়
জায়গা। দক্ষিণ দিকের ছোট
বারান্দাটি জেনিফারেরও পছন্দ
ছিল। অজস্র দিন দুজনে এখানে বসে চা
খেয়েছে। শামসুল আলম ঘাড় কাত করে
আকাশ দেখে। টুকরো আকাশ। চারপাশে
হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের কারণে Love story
আকাশের অখণ্ডতা দেখা যায় না।
যেটুকু দেখতে পাচ্ছে, সেই আকাশভরা
ঘন কালো মেঘ দেখতে পায় শামসুল
আলম। বৃষ্টি নেই, ঠান্ডা বাতাসও না।
জমাট বাঁধা মেঘ স্তব্ধ করে দেয়
তাকে। মেঘ জেনিফারের খুব প্রিয়
ছিল, বৃষ্টি না। ও বলত, বৃষ্টি আমার আনন্দ
নষ্ট করে দেয়। মেঘের ভেসে থাকায়
আমি প্রেমের আশ্চর্য স্নিগ্ধতা উপভোগ
করি। Love story
শামসুল আলমের দুহাত মুঠিতে নিয়ে
বলত, বর্ষায় ঘনকালো মেঘ, ‘তোমার
দেশে এসে আমার এই মেঘ দেখা
হয়েছে শামসু। আমি এই মেঘে তোমার
ভালোবাসার আকাশ দেখতে পাই।
তোমার ভালোবাসা আমাকে
ভরিয়ে দেয়।’ Love story
ঘরে ঢুকে ডায়েরিতে কথা কয়টি
লিখে ফেলে শামসুল আলম। লিখে বেশ
স্বস্তি বোধ করে। আনন্দও হয়। ডেক
ছেড়ে দিলে সুচিত্রা মিত্রের কণ্ঠস্বর
ভেসে আসে। জেনিফারের প্রিয় গান
ধ্বনিত হয় ঘরজুড়ে, ‘সীমার মাঝে অসীম
তুমি বাজাও আপন সুর...।’ Love story
জেনিফার হাসতে হাসতে বলত, ‘এটাই
সবচেয়ে সুন্দর প্রেমের গান।’
শামসুল আলমের মনে হয়, এত দিনে সে
নিঃসঙ্গতার আসল অর্থ খুঁজে পেয়েছে।
আগে একা থাকলে মন খারাপ হয়ে
যেত। এখন একাকিত্ব মানে Love story
জেনিফারকে অনুভব করার পূর্ণতা।
স্মৃতি মহাসমুদ্রের মতো কল্লোলিত হয়।
ভরে যায় বুকের সবটুকু। তা শুধু স্থির
থাকে না, প্রবাহিত হয়। এই অনুভব শামসুল
আলমকে দ্বিতীয় জন্মের মগ্নতা দেয়। এই
বাড়িতে জেনিফার নেই, এটা আর
জোর করে মানতে হয় না। এই তো আসনে
আছেও। হাত বাড়িয়ে সবকিছু ছোঁয়ার
মধ্যে জেনিফার। টেলিফোনে কণ্ঠস্বর
পাওয়া যায়—কানে কানে কথা হয় ওর
সঙ্গে। ফেসবুকে আছে। স্কাইপেতে
মুখোমুখি দেখা হয়।
তারপরও শামসুল আলমের বুকভরা
দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ওড়ে। সুখে
উচ্চারিত হয় মৃদু কথা, হায় জীবন!
ভালোবাসার আবেগ ঢুকে গেছে
ইন্টারনেট। ৭৫ বছর বয়সে এমন অনুভূতি
শামসুল আলমকে বিষণ্ন করে ফেলে।
বিবাহিত জীবনের ৪৭ বছরে এসে
জেনিফার সরাসরি চোখের দিকে
তাকিয়ে একদিন বলল, ‘এবার আমি
নিজের দেশে ফিরে যেতে চাই।’
‘ফিরে যাবে? কেন?’
‘অনেক দিন তোমার দেশ দেখেছি।
শেষ দিনগুলো নিজের দেশে থাকতে
চাই। তুমিও আমার সঙ্গে চলো।’
শামসুল আলম চুপ করে থাকে।
অসহিষ্ণু কণ্ঠে জেনিফার জিজ্ঞেস
করে, ‘যাবে না?’
‘আমিও তো আমার শেষ দিনগুলো
নিজের দেশে কাটাতে চাই।’
তুমি অত্যন্ত স্বার্থপরের মতো কথা
বললে শামসু। তুমি একটুও ভাবলে না যে
আমি ৪৭ বছর এ দেশে কাটালাম। এখন
চলো দুজনে গিয়ে আমার দেশে
থাকি।
শামসুল আলম সরাসরি অন্যদিকে
তাকায়। জেনিফারের মুখের ওপর
থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। জেনিফার
জবাব না পেয়ে উঠে চলে যায়। দুজনেই
বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি থেকে অবসর
নিয়েছে। ছেলে দুটো পড়ালেখার
জন্য স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায়
গিয়েছে। বাড়িতে তারা দুজন ছাড়া
কাজের ছেলে মাসুম ও ড্রাইভার-
দারোয়ান আছে। শুধু বসে আড্ডা
দেওয়ার মতো বন্ধুর অভাব। দুজনে
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাড়ি
ছেড়ে ঢাকায় নিজেদের বাড়িতে
বাস করছে। তাও বছর সাতেক হয়ে
গেছে। অমিয় আর দ্বিতীয় চলে গেছে
তাও বছর তিনেক হয়ে গেল। ছেলেরা
বলেছে, ওরা আর দেশে ফিরবে না।
বাবা-মা যেন আমেরিকায় ওদের
কাছে গিয়ে থাকে। এ কথায় শামসুল
আলম খুব মন খারাপ করেছে। জেনিফার
ওদের ফেরা না-ফেরা নিয়ে মাথা
ঘামায় না। উল্টো বলে, ‘ওদের জীবন
ওরা বেছে নিয়েছে। আমি হ্যাপি।
লেট দেন লিভ পিসফুলি।’
শামসুল আলম হা হা করে হেসে বলেছে,
‘এই সময় কারও লাইফ পিসফুল হয় না। তুমি
আর আমি পিসফুল লাইফ কাটিয়েছি।
আমাদের ৫০ বছর পূর্ণ হলে আমরা দিনটি
বড় করে সেলিব্রেট করব।’
সেদিন জেনিফারের চোখে খুশির
আভা দেখেনি শামসুল আলম। ও কেমন
যেন অন্যমনস্ক ছিল। ভুরু জোড়া অন্য
রকমভাবে কুঁচকে ছিল। শামসুল আলমের
মনে হয়েছিল ওকে একদম অন্য রকম
লাগছে। জেদি, একরোখা বা অন্য
কোনো শব্দ ব্যবহার করা যেতে
পারে ওর জন্য। শামসুল আলম তা করেনি।
খানিকটুকু খটকা নিয়ে চুপ করে রইল।
বিবাহিত জীবনের এত বছরে এভাবে
ভুরু কুঁচকায়নি জেনিফার। সেই ভঙ্গির
সঙ্গে এই ভঙ্গির অনেক দূরত্ব। আজ নতুন
জেনিফার ওর সামনে। ৭২ বছর বয়সে
এসে জেনিফার কেন ওর প্রেমের
পৃথিবী থেকে বেরিয়ে যেতে
চাইছে? প্রেমের শুরুর দিনগুলোতে কী
এক গভীর উন্মাদনা ছিল দুজনের। কী
গভীর হৃদ্যতায় জেনিফার বারবারই বলত,
প্রেমের কোনো সীমান্ত নেই শামসু।
আমাদের সামনে আছে প্রেমের বিশ্ব।
আজ কী হলো জেনিফারের?
শামসুল আলমের চোখে পানি আসে।
জেনিফার তাকে বলত, ‘প্রেমের
সীমান্ত শুধুই নীল আকাশ। প্রেমের খুঁটি
ফুল মুন। প্রেমের লুকোচুরি চোখের
ছুটোছুটি।’—এসব বলে প্রবল হাসিতে ঘর
ভরিয়ে দিয়ে বলত, ‘তোমার-আমার
প্রেমের বাঁধন রংধনুর রঙে হয়েছে
শামসু। আমাদের মহাকাশে হাজার
রঙের ছড়াছড়ি।’
জেনিফার এমন কথা বলে দীর্ঘ উষ্ণতায়
ভরিয়ে দিত দীর্ঘ সময়। তখনো শীতল
প্রবাহ ছোঁয়নি শামসুল আলমকে। ওই
মুহূর্তে ওর মনে হয়েছিল, বরফের অতল
গহ্বরে পড়ে যাচ্ছে ও। তারপরও
নিজেকে টেনে তোলার জন্য বিড়বিড়
করে বলেছিল, আমাদের প্রেম তো
জ্যোৎস্নাভরাই ছিল, জেনিফার।
প্রেমের বাইরে জীবন কাটাইনি।
আমার কাছে প্রেমের ফুল মুনই সত্য। তবে
আজ কেন তোমার দেশে ফেরার কথা
মনে হচ্ছে? তুমি তো দেশ থেকে দূরে
ছিলে না। আমরা বছরে না হলেও
দুবছরে তিন বছরে আসা-যাওয়া
করেছি। তাহলে তুমি এমন করে ভাবছ
কেন? কেন সম্পর্কের চেয়েও নিজের
কাছে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে বেশি
হয়ে গেল? নিজের আপন জগৎ? শিকড় আর
লতাপাতায় ভরা? শুনতে পায় নিজের
ভেতরের শব্দ, তুমিও তো জেনিফারকে
এই উত্তর দিয়েছ শামসুল আলম, তুমি কেন
প্রেমের জন্য দেশ ছাড়তে পারবে না?
কিছুকাল তো ওর দেশে কাটিয়ে
আসতে পারো?
না, অসম্ভব। ওর দেশে আমি বিদেশি।
বিদেশির যত অধিকারই থাকুক, আমি
তাকে সম্মানজনক মনে করি না।
শামসুল আলম দুহাতে নিজের চুল আঁকড়ে
ধরে। এ-ও একধরনের মানসিক আশ্রয়। চুল
ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলে, যেদিন
এডিনবরার আকাশে পূর্ণচন্দ্র
দেখেছিলাম সেদিন জেনিফার
বলেছিল, একমাত্র আমার প্রেম
নিভিয়ে দেবে, আর কিছুতে প্রেমে
টান পড়বে না। শামসুল আলম বলেছিল,
আমি তোমার আগে আমার মৃত্যু চাই।
মৃত্যুর সময় যদি বিছানায় থাকি, তাহলে
তোমার হাত ধরে রাখব।
সেদিন জেনিফারের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে
গিয়েছিল। কথা বলেনি। দ্রুতপায়ে
বাথরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করেছিল। ওর
মৃদু কান্নার শব্দ আচ্ছন্ন করে বলেছিল
শামসুল আলমকে। যেন এই নিঃসঙ্গ
বাড়ির সবখানে কান্নার শব্দ জমে
বরফের মতো জমাট বেঁধে আছে।
জেনিফারকে এয়ারপোর্টে বিদায়
দিয়ে বাড়ি ফেরার পরে অনেকক্ষণ
কেঁদেছিল শামসুল আলম। মনে হয়েছিল,
নিজের শৈশবেও তাকে এমন করে
কাঁদতে হয়নি। নিজের কান্নার শব্দও
জেনিফারের কান্নার সঙ্গে
মিলেমিশে এক হয়ে যায়।
এক বিকেলে ফোন আসে
জেনিফারের।
‘তুমি কেমন আছো, শামসু?’
‘আমি জানি না আমি কেমন আছি।’
শব্দ করে হাসতে থাকে জেনিফার।
শামসুল আলম সেই শব্দ নিজের দুকানে
তুলে নেয়। হাসি থাকলে জেনিফার
বলে, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে তুমি পড়াতে
ইকোনমিকস, এখন দেখছি তোমার
সাবজেক্ট হয়েছে ফিলসফি।’
প্রেমের শুরুর দিনগুলোতে কী এক গভীর
উন্মাদনা ছিল দুজনের। কী গভীর
হৃদ্যতায় জেনিফার বারবারই বলত,
প্রেমের কোনো সীমান্ত নেই শামসু।
আমাদের সামনে আছে প্রেমের বিশ্ব।
আজ কী হলো জেনিফারের?
আবার তরঙ্গ তোলা হাসি। শামসুল
আলমের মন খারাপ হয়। তাহলে
জেনিফার নিজ দেশে খুব ভালো
আছে। ওর প্রাণের ভেতরে সুবাতাস
বইছে।
‘তুমি এত গম্ভীর হয়ে আছো কেন,
শামসু? তোমার কাছ থেকে উষ্ণতা
পাচ্ছি না।’
‘তুমি কেমন আছো, জেনিফার?’
‘আমি ভালো আছি। আমাদের দিনের
শুরুতে তুমি যখন এডিনবরার মাটি-
বাতাসে শ্বাস নিতে, তখন আমরা
যেসব জায়গায় ঘুরতে যেতাম, এখন আমি
সেসব জায়গায় গিয়ে বসে থাকি।
বেশ এনজয় করি। কখনো মনে হয়, তুমি
আমাকে দীর্ঘ চুমুতে ভরিয়ে দিয়ে বলছ,
জেনিফার, আমাদের ভালোবাসা এখন
আমি একই শারীরিক উষ্ণতায় প্রেমের
নতুন অনুভবে ভরে থাকি।’
জেনিফারের উচ্ছ্বাসপূর্ণ কণ্ঠস্বরে মন
খারাপ হয়ে যার শামসুল আলমের।
আশ্চর্য! ও এত নিষ্ঠুর। পরক্ষণে নিজেকে
শাসায়, কেন এমন ভাবছি! নিজের
প্রেমও কি উবে গেছে?
ভেসে আসে জেনিফারের কণ্ঠস্বর,
‘তোমার কি মন খারাপ, শামসু? নাকি
শরীর খারাপ?’
‘আমার মন খারাপ, শরীরও খারাপ। কিছুই
ভালো লাগে না। বেঁচে থাকতে
ইচ্ছে করে না।’
‘তুমি ভালো থাকো, শামসু। আমি
তোমাকে দেখতে আসব।’
উৎফুল্ল হয়ে ওঠে শামসুল আলম।
‘সত্যি আসবে? কবে?’
‘মাস দু-একের মধ্যে। সবকিছু ঠিকঠাক
করতে পারলে আগেও আসতে পারি।’
‘থ্যাংক গড। তুমি ভালো থাকো
জেনিফা। আমি তোমার আসার
অপেক্ষায় থাকব।’
আবার সেই উচ্ছ্বসিত হাসি। হাসির
মাঝে কেটে যায় ফোন। শামসুল আলম
মগ্ন চৈতন্যে শিস বাজায়। আজ
আমাদের ছুটি। জীবনের কাঠঘর থেকে
ছুটি। চেয়েছিলাম কাঠের ওপর ছবি
আঁকতে। রং-তুলিতে ঘর সাজানো হয়
কিংবা হয় না। মানুষ তো অনবরত
নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে। যুদ্ধ করে হেরে
যাওয়া নিয়তি যুদ্ধ করে বিজয়ী হওয়া
সাহসী। থেমে যায় ভাবনা। শামসুল
আলম টের পায় জ্বর এসেছে। বুকের
কাছে ব্যথা হচ্ছে। শামসুল আলম সোফায়
মাথা হেলিয়ে দেয়।
মাস খানেকের মাথায় জেনিফার ই-
মেইলে ওর আসার খবর জানায়। সঙ্গে
ভালোবাসার বাক্য দিয়ে ভরিয়ে
দেয় ই-মেইলের বাকি অংশ। ই-মেইলের
হার্ড কপি কতবার পড়ে তার ঠিক নেই,
সঙ্গে দুহাতে চোখের জল মোছে।
বুঝতে পারে শরীর ভালো নেই।
ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার।
পরে ভাবে, জেনিফার আসুক, দুজনে
একসঙ্গে ডাক্তারের কাছে যাবে।
বিছানায় জেনিফারের ছবিগুলো
করা আছে। যখন ইচ্ছা হয় সে ছবি দেখে।
কখনো বুকের ওপর রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
যেদিন জেনিফার আসবে, তার আগের
রাতে ড্রাইভারকে এয়ারপোর্টে
যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে ঘুমানোর জন্য
দরজা বন্ধ করে শামসুল আলম। তারপর দিন
সে দরজা আর খোলে না। জেনিফার
বাড়িতে পৌঁছে দেখতে পায় মাসুম
সিঁড়িতে বসে গুনগুনিয়ে কাঁদছে।
জেনিফার ওর মাথায় হাত রেখে
জিজ্ঞেস করে, ‘কাঁদছিস কেন? কী
হয়েছে?’
‘স্যার আজ সকালে দরজা খোলেনি।’
‘দরজা খোলেনি?’ চমকে ওঠে
জেনিফার। কয়েক দিন আগে ফোনে
কথা হলে বলেছিল, ‘শরীর ভালো নেই।
তোমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে
যাব।’ জেনিফার দরজায় দাঁড়িয়ে টুকটুক
শব্দ করে। ভেতর থেকে কোনো সাড়া
নেই। আস্তে আস্তে শব্দে জোর বাড়ায়।
তা-ও সাড়া নেই। শব্দ করে কেঁদে ওঠে
জেনিফার। শেষে চোখ মুছে
আত্মীয়স্বজনকে ফোন করতে শুরু করে।
ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন এসে জড়ো হয়
বাড়িতে। ছোট ভাই নূরুল আলম বলে,
‘আমাদের দরজা ভাঙা ঠিক হবে না।
আমাদের উচিত থানায় ফোন করা।
পুলিশ আসুক।’
সবাই সায় দেয়।
থানায় ফোন করলে পুলিশ আসে। দরজা
ভাঙা হয়। সবার আগে এগিয়ে যায়
জেনিফার। দেখতে পায় ওর ছবি বুকের
ওপর রেখে না-ফেরার দেশে চলে
গেছে শামসুল আলম। তার নিশ্বাসের
সঙ্গে বুকের ওঠানামা নেই। ও এগিয়ে
গিয়ে শামসুল আলমের ডান হাত ধরে।
শীতল হাতে উষ্ণতা নেই। বিড়বিড়
করে বলে, এমন তো কথা ছিল না যে
আমাকে রেখে চলে যাবে তুমি।
সঙ্গে সঙ্গে খাটের পাশে বসে পড়ে
দু-হাতে জড়িয়ে ধরে শামসুল আলমের
হাত। নিজেকেই বলে, তোমার এই
শীতল হাতই আমাদের প্রেম। তুমি যাচ্ছ,
এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াও। আমি আসছি।
