Responsive Ad Slot

Hot Games

Startup

Trends

Tech

বিশ্ব জুড়ে মোহাম্মদ আলি কেন এত বেশী জনপ্রিয়?

Tuesday, June 7, 2016


বিংশ শতাব্দীতে পুরো বিশ্বকে চমকে দিয়ে এক বক্সিং যাদুকরের আবির্ভাব ঘটেছিল। পরবর্তীকালে শুধু নির্দিষ্ট যুগ নয়, সব যুগ আর কালের সেরা ক্রীড়াবিদের খেতাব জিতেছিলেন সেই বক্সিং যাদুকর। তিনি আর কেউ নন বক্সিং কিংবদন্তি মোহাম্মদ আলি ক্লে। ১৯৪২ সালের ১৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্টাকির লুইসভিলে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বখ্যাত এ মহামানব বক্সিং সম্রাট। তার বক্সিংয়ে আসার একটি ছোট্ট গল্প আছে। ১৯৫৪ সাল। তখন ক্যাসিয়াস মার্সেলাস ক্লে’র বয়স মাত্র ১২ বছর। তার একটি প্রিয় সাইকেল ছিল। একদিন এক চোর তার শখের সাইকেলটি চুরি করল। বালক ক্লে যান স্থানীয় একটি পুলিশ স্টেশনে মার্টিন নামের এক পুলিশ অফিসারের কাছে। তিনি তার চুরি যাওয়া সাইকেলটি উদ্ধারের জন্য পুলিশ অফিসারকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, সাইকেল উদ্ধার করতে পারলে এবং চোর ধরতে পারলে সে সেই চোরকে একটি ঘুষি মারবে। তখন সেই রসিক পুলিশ অফিসার বালক ক্লেকে বললেন যে, ঘুষি মারতে হলে তো প্রশিক্ষণ দরকার। আসলে মার্টিন ছিল স্থানীয় একটি বক্সিং ক্লাবের কোচ। সেজন্য তার অধীনে চার বছর ক্লেকে বক্সিং শিখান। সেদিন বালক ক্লে তার মনের ভিতরে শখের সাইকেল চুরির জেদের জন্য বক্সিংটি খুব ভালোভাবে রপ্ত করেছিল। তারপর তাকে আর কখনো পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি মাত্র ১৫-২০ বছরের বক্সিং জীবনে মোট ৬১টি লড়াইয়ে অংশ নিয়ে ৫৬টিতেই জিতেছিলেন, আর হেরেছিলেন মাত্র ৫টিতে। ১৯৬০ সালে প্রথম তিনি রোম অলিম্পিকে বক্সিংয়ে স্বর্ণপদক ছিনিয়ে নেন। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে হেভিওয়েট বক্সিংয়ে লড়েন ১৯৬৪ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে। আর সে সময়ই তিনি সুন্নী মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে মোহাম্মদ আলি ক্লে নাম ধারণ করেন। তারপর ১৯৬৪-৬৭, ১৯৭৪-৭৮ এবং ১৯৭৮-৮০ সময়ের জন্য তিনবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ছিলেন তিনি। ১৯৬৪ তে একবার ব্যর্থ হওয়ার পর ১৯৬৫ তে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার তাকে ভিয়েতনামে চলমান যুদ্ধে যোগ দেওয়ার কথা বললে, ভিয়েতনামীরা তাকে কালো বলে গালি দেয়নি জানিয়ে তিনি সেখানে যেতে অস্বীকৃতি জানান। সেজন্য ১৯৬৭ সালে তাকে এক বছরের জন্য খেতাব ও বক্সিং লাইসেন্স কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু পরে আবার তা ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। তিনি একজন ক্রীড়াবিদ হয়েও ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় যুদ্ধে অংশ নেননি। সেজন্য তিনি সারা দুনিয়ার অনেক মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন। আমরা ইতিহাস থেকে জানি, সাদা চামড়া অধ্যুষিত এসব দেশে কালো মানুষদের অনেক নির্যাতন, নিপীড়ন ও নিগ্রহের স্বীকার হতে হয়েছে। আর এধরনের নিগ্রহ যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই হয়েছে তা নয়। তাদের সমর্থন ও ছত্রচ্ছায়ায় থাকা দেশগুলোতেও এমন ঘটনা ঘটেছে সবসময়। সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রে মার্টিন লুথার কিং তার জীবদ্দশায় এগুলোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন মেন্ডেলা তার পুরো জীবন উত্সর্গ করেছিলেন কালো মানুষদের অধিকার আদায়ের জন্য। মোহাম্মদ আলি, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন মেন্ডেলার মতো ব্যক্তিত্বের এসব সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়েই যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে বারাক ওবামার মতো কালো মানুষের সর্বোচ্চ প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়া সম্ভব হয়েছে। তিনি তার বাংলাদেশি ভক্তকুলের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তখন তিনি লাখ লাখ ভক্তের সামনে গিয়াস উদ্দিন নামের ১২ বছরের এক বালক বক্সারের সাথে একটি প্রতীকী লড়াইয়ে অংশ নিয়ে তিনি হেরে যাওয়ার অভিনয় করে কোটি কোটি বাঙালিকে সেদিন আপ্লুত করেছিলেন। তিনি যখন প্রায় ৩২ বছর যাবত্ পারকিনসন্স রোগে ভোগার পর গত ৩ জুন ২০১৬ সালে ৭৪ বছর বয়সে যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন গোটা বাঙালি জাতিই কেঁদে উঠেছিল। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের ক্রীড়া সংগঠকবৃন্দ। শোক জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বর্তমানে মুসলিম বিদ্বেষী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বক্সার, ক্রীড়াবিদ এমনকি শোবিজ তারকাবৃন্দ পর্যন্তও। মোহাম্মদ আলির শেষ কৃত্যানুষ্ঠানে বিল ক্লিনটন উপস্থিত থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি হেভিওয়েট বক্সিংকে দিয়েছেন অন্যরকম শিল্পের মাত্রা। কারণ তার বক্সিংয়ের যে একটি রিদম আছে তাকে ‘প্রজাপতির মতো নাচব, মৌমাছির মত হুল ফোটাব’ হিসেবে সারাবিশ্বে বর্ণনা করা হয়। একই গুণে গুণান্বিত করে রেখে গেছেন তার মেয়ে পেশাদার বক্সার লায়লা আলি, যাকে আমরা সবাই চিনি। তার ক্রীড়া নৈপুণ্য এবং কিছু সামাজিক মানবতাবাদী দায়দায়িত্বের কারণেই আজকে তার মৃত্যুর পর বিশ্বময় তাকে নিয়ে এত হুলস্থূল শুরু হয়েছে। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন তার ভক্তবৃন্দ। আমাদের বাংলাদেশও এ থেকে বাদ যাচ্ছে না। সকলের প্রত্যাশা, যুগে-যুগেই ফিরে আসুক এরকম হাজারো মোহাম্মদ আলি।


n লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
email: hkabirfmo@yahoo.com

Latest

Blog Archive

Hit Me